ভৌগলিক ভাবে নাজুক অবস্থানের কারণে বড় ধরনের ভূমিকম্প (Earthquake) ঝুঁকির মধ্যে অবস্থান করছে বাংলাদেশ। যে কোন সময় ঘটে যেতে পারে ভয়াবহ বিপর্যয়। কারণ বাংলাদেশ অবস্থান করছে ভারতীয়, ইউরেশীয় এবং মায়ানমারের টেকটনিকপ্লেটের মধ্যে। বিশেষজ্ঞগণ মনে করেন, ভারতীয় ও ইউরোপীয় প্লেট দুটি ১৯৩৪ খ্রিস্টাব্দের পর থেকে দীর্ঘদিন যাবত হিমালয়ের পাদদেশে আটকা পড়ে আছে, অপেক্ষা করছে বড় ধরনের নড়াচড়া বা ভূমিকম্পের। বিশেষ করে উত্তর ও উত্তর-পূর্ব দিকের ফল্ট লাইন (ভূচ্যুতি, টেকটোনিক প্লেটের সচলতার কারণে এই ফল্ট লাইন তৈরি হয়) সক্রিয় থাকায় ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে পুরো উপমহাদেশীয় এলাকা। শনিবারের ভূমিকম্পটি প্লেট দুটির সেই বড় ধরনের নড়াচড়ার প্রমাণ। এর আগে একই ফল্ট লাইনের উত্তরপ্রান্তে পাকিস্তান ও পূর্বপ্রান্তে আন্দামান সাগরে বড় মাত্রার ভূমিকম্প (Earthquake) হওয়ায় এখন মধ্যাঞ্চলের বাংলাদেশ সীমান্তে যে কোন সময় শক্তিশালী ভূমিকম্প (Earthquake) হতে পারে।
| ভূমিকম্প এর বড় ধরনের হুমকির মুখে বাংলাদেশ - (Earthquake) |
ভূ-বিজ্ঞানীগণ মনে করেন, ভূ-গর্ভস্থ টেকটোনিক প্লেটের সংঘর্ষ, আগ্নেয়গিরি ও মানবসৃষ্ট কারণে পৃথিবীতে ভূমিকম্প (Earthquake) হয়ে থাকে। ভূ-ত্বক কতগুলো প্লেটে বিভক্ত, এগুলোকে বলে টেকটোনিক প্লেট। আর বাংলাদেশ অবস্থান করছে তিনটি টেকটোনিক প্লেটের মাঝখানে। এগুলো হল ভারতীয়, ইউরেশিয় ও মায়ানমার টেকটোনিক প্লেট। তারা আরো মনে করেন, বাংলাদেশের উত্তরে অবস্থান করছে যে ইন্দো-অস্ট্রেলীয় প্লেট, সেটি প্রতি বছর ৪৫ মিলিমিটার করে ইউরেশিয় প্লেটের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বাংলাদেশ শুধু ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চলেই (সিসমিক জোন) অবস্থিত নয়; বরং জাতিসংঘের এক জরিপে বিশ্বের ২০টি ভূ-তাত্তিক ঝঁকিপূর্ণ শহরের অন্যতম হল আমাদের রাজধানী ঢাকা। ১৯৯৯ সালে জাতিসংঘের অধীনে ‘রিস্ক অ্যাসেসমেন্ট টুলস ফর ডায়াগনসিস অব আরবান এরিয়াস এগেইনস্ট সিসমিক ডিজাস্টার (রেডিয়াস)’ এই জরিপ পরিচালিত হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের কলোরাডো বিশ্ববিদ্যালয়ের রজার বিল হাম তার গবেষণায় বলেছিলেন, হিমালয়ের পাদদেশে মেইন বাউন্ডারি ট্রাস্ট (এমবিটি) রয়েছে, যা বাংলাদেশ থেকে ৪০০ কিলোমিটার উত্তরে। এখানে ইউরেশিয়া প্লেটের নিচে ভারতের যে প্লেটটি তলিয়ে যাচ্ছে, সেটি লক হয়ে আছে। এটি খুলে গেলেই বাংলাদেশ, ভুটান ও নেপালে ৮ মাত্রার ভূমিকম্প (Earthquake) হতে পারে। নেপালে শনিবারের ভয়াবহ ভূমিকম্পের কারণে তাঁর সেই আশংকা বাস্তব রূপ নিচ্ছে বলেই মনে হয়।
২০০৫ সালে দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞদের বরাত দিয়ে ওয়াশিংটনে একটি বার্তা পাঠিয়েছিল ঢাকার মার্কিন দূতাবাস। তাতে বলা হয়, আগামী ১০ বছরের মধ্যে বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশে ৮ বা তারও বেশি তীব্রতার ভূমিকম্প (Earthquake) হতে পারে। তাও আবার একটি-দুটি নয়, এ ধরনের অন্তত সাতটি ভূমিকম্প (Earthquake) আঘাত হানতে পারে। ২০০৫ সালের ২৭ এপ্রিল ওই তারবার্তাটি পাঠান ঢাকার মার্কিন দূতাবাসের চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স জুডিথ চামাস। সম্প্রতি বিকল্পধারার গণমাধ্যম উইকিলিকস অন্য অনেক তারবার্তার সঙ্গে এটিও ফাঁস করে।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মেহেদী আহমেদ আনসারী বলেন, ‘বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে বছর দেড়েক আগে আমাদের একটি গবেষণা শেষ হয়েছে। সেখানে আমরা দেখিয়েছি রিখটার স্কেলে ৭ দশমিক ৫ থেকে ৭ দশমিক ৯ মাত্রায় বাংলাদেশে ভূমিকম্প (Earthquake) হলে শুধু রাজধানীতেই আড়াই লাখ লোক মারা যেতে পারে। ৪ শতাধিক ভবন মাটির সঙ্গে মিশে যেতে পারে। নেপালে যেটা ঘটেছে আমাদের অবস্থা হতে পারে তার চেয়েও ভয়াবহ।’ তিনি আরও বলেন, ‘বুয়েটে আমাদের যে ব্যবস্থা আছে তাতে দেখা যাচ্ছে ২৫ এপ্রিলে বাংলাদেশে ভূমিকম্পের মাত্রা ছিল রিখটার স্কেলে ৪ থেকে ৫-এর মধ্যে।’
বাংলাদেশ আর্থকোয়েক সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক ও বুয়েটের অধ্যাপক ড. মুনতাজ আহমেদ নূর বলেন, বাংলাদেশ খুব নাজুক অবস্থায় রয়েছে। দেশের উত্তর ও পূর্বাঞ্চলের জেলাগুলো ভূমিকম্পের জন্য সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ হলেও অপরিকল্পিত নগরায়ণের জন্য ঢাকা ও চট্রগামও রয়েছে বড় ধরনের ঝুঁকির মধ্যে।
ভূমিকম্প (Earthquake) বিশেষজ্ঞ ড. মাকসুদ কামাল কালের জানান, ভূতাত্তি্বক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশ ভূমিকম্প (Earthquake) দুর্যোগের জন্য ঝুঁকিপ্রবণ। ভূমিকম্প (Earthquake) সাধারণত সংঘটিত হয় ভূতাত্তি্বক প্লেট বাউন্ডারি কিংবা ফাটলরেখা বরাবর। বাংলাদেশের পূর্ব সীমান্তে রয়েছে ভারত ও বার্মিজ খণ্ডিত প্লেটের বাউন্ডারি এবং দেশের অভ্যন্তরে শক্তিশালী ভূমিকম্প (Earthquake) সৃষ্টি করার মতো রয়েছে তিনটি ফাটলরেখা। দেশের মধ্যবর্তী অঞ্চলে রয়েছে প্রায় ৬০ কিলোমিটার দীর্ঘ মধুপুর ফাটলরেখা। ভারতের উত্তর-পূর্ব মেঘালয় অঞ্চল ও বাংলাদেশের সিলেট-ময়মনসিংহ সীমান্ত অঞ্চলে রয়েছে প্রায় ২৩০ কিলোমিটার দীর্ঘ ডাউকি ফাটলরেখা। আবার দেশের পূর্ব প্রান্তে বাংলাদেশ-ভারত-মিয়ানমার সীমান্ত বরাবর রয়েছে প্রায় এক হাজার ৬০০ কিলোমিটার লম্বা পূর্বাঞ্চলীয় সুদীর্ঘ ফাটলরেখা, যা আন্দামান নিকোবর থেকে শুরু করে হিমালয়ের দক্ষিণ-পূর্ব প্রান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত।
গত ১৫০ বছরে বাংলাদেশে ৭টি বড় আকারের ভূমিকম্প (Earthquake) হয়েছে। এর মধ্যে দুটির কেন্দ্র ছিল বাংলাদেশের অভ্যন্তরে। এর একটি হয় ১৯১৮ সালের ৮ জুলাই। ৭.৬ মাত্রার সেই ভূমিকম্পের কেন্দ্র ছিল সিলেটের শ্রীমঙ্গলে। আর ১৮৮৫ সালের ১৪ জুলাই একই মাত্রার ভূমিকম্প (Earthquake) হয়, যার কেন্দ্র ছিল মানিকগঞ্জে। আরও কয়েকটি ভূমিকম্প (Earthquake) বাংলাদেশের কেন্দ্রে না হলেও রেখে গেছে ধ্বংসের চিহ্ন।
বিশেষজ্ঞরা আরো জানিয়েছেন, রাজধানী ঢাকার ৬৫ শতাংশ এলাকা ভবন নির্মাণের উপযোগী নয়। তারপরও ঝুঁকি নিয়েই সেসব এলাকায় বহুতল ভবন গড়ে উঠছে। বিশেষ করে রাজধানীর নদী, খালবিল, পুকুর ভরাট করে বাড়ীঘর তৈরি করার কারণে রামপুরা, বেগুনবাড়ী খালের আশপাশ, পাগলা খালের দক্ষিণে বুড়িগঙ্গার দক্ষিণ এলাকা, আদাবর, বসুন্ধরা, বনশ্রী, শ্যামলী ও তুরাগ নদী সংলগ্ন এলাকায় ক্ষয়-ক্ষতির পরিমাণ হবে সবচেয়ে বেশি। কারণ এসব এলাকার মাটি তুলনামূলকভাবে নরম। তবে শক্ত মাটিতে (মধুপুর ব্লে বা লাল রঙের মাটি) এ ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে কম। এছাড়া অপরিকল্পিত নগরায়ণ, মানসম্মতভাবে মাটির গুণাগুণ যাচাই ও পাইলিং না করা, বিল্ডিংকোড অনুসরণ ও ভূমিকম্প-সহনীয় করে তৈরি না করা এবং নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহার করার কারণে মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্পেও নেমে আসতে পারে বড় ধরনের বিপর্যয়।
from EBIZ NEWS - ২৪ ঘন্টা অনলাইন ব্যাবসায়িক সংবাদ এবং ই-কমার্স নিউজ - www.ebiz-news.com http://ift.tt/1OGDMcj
via EBIZ-NEWS.COM

Post a Comment